"মহা নায়কের মহা কাব্য"
""মহানায়কের মহাকাব্য""
"একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি।একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙ্গালিদের সাথে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা ,অক্ষয় ভালোবাসা,যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্ব কে অর্থবহ করে তোলে।"-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মজীবনী লিখেছিলেন কারাকক্ষে বসে।জন্ম থেকে শুরু করে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের মহা-আলেখ্য এই আত্মজীবনীটি।বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনী টি দীর্ঘদিন আলোর মুখে দেখেনি।হয়তো এটি হারিয়েই যেত মহাকালের অন্ধ স্রোতে,কিন্তু ইতিহাস সম্ভবত নিজ থেকেই প্রকাশিত হতে চায়।সম্ভবত এ কারণেই ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনীটি আকস্মিক ভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়।১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীন থাকা অবস্থায় এটি লিখেছিলেন তিনি,কিন্তু শেষ করে যেতে পারেন নি।তবে যেটুকু আমরা পেয়েছি,সেটুকুই ইতিহাসের অতি-মূল্যবান সম্পদ এবং দলিল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' আমাদের কে একজন অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু নয়,একজন সাধারণ মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের অসাধারনত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।পূর্ব পুরুষদের পরিচিতি,নিজের ছোটবেলা,বেড়ে ওঠা,রেণুর সাথে বিয়ে,অসুস্থতায় পড়াশুনায় ছেদ পড়া- এগুলো যেন আমাদের খুব পরিচিত কাছের মানুষের দিনলিপি।একই সাথে একজন সাধারণ ছাত্রের অসাধারণ হয়ে ওঠা,রাজনীতিতে প্রবেশ,ছাত্র রাজনীতি,রাজনীতির বিভিন্ন বাঁক উপবাক,বারংবার কারা বরণ সহ অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সমারোহে বইটি পরিণত হয়েছে এক অসামান্য প্রামাণ্য দলিলে।
বঙ্গবন্ধু যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন তখন মুসলমানরা লড়ছে একটি স্বাধীন ভুখন্ডের জন্য,ভারতীয় উপমহাদেশ তখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে।ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হতে চলেছে ভারতবর্ষ- গঠিত হতে যাচ্ছে পাকিস্তান ও ভারতের রূপরেখা।বরাবরই বঞ্চিত পূর্ববাংলা তখন স্বপ্ন দেখছে নিজেদের একটি দেশের,যার ভিত্তি হবে ধর্ম কিন্তু সেখানে থাকবে সকলের সমান অধিকার।পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লীগের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন শেখ মুজিব।বই এর শুরুতে সে সময়ের ব্যস্ত লড়াকু দিন গুলোর কথাই বিবৃত করেছেন তিনি।তিনি রাজনৈতিক জগতে,বাংলার আকাশে গনগনে সূর্য হতে পেরেছেন।এর পিছনে তাঁর পরিবারের ভূমিকা কে অস্বীকার করা যায়না।পরিবারের সকলের সমর্থন ছিল বলেই হয়তো তিনি পারি দিতে পেরেছেন এত দীর্ঘ বন্ধুর পথ।
বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে বলছেন- "কলকাতা যাব,পরীক্ষাও নিকটবর্তী।লেখাপ
ড়া তো মোটেই করিনা।দিনরাত রিলিফের কাজ করে কূল পাইনা।আব্বা আমাকে এ সময় একটা কথা বলেছিলেন,"বাবা রাজনীতি কর,আপত্তি করবনা,পাকিস্তানের জন্য লড়ছ এতো সুখের কথা,তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না।লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবা না।আর একটা কথা মনে রেখ,'sincerity of purpose and honesty of purpose' থাকলে জীবনে পরাজিত হবানা"।একথা কোনদিন আমি ভুলি নাই।" অসমাপ্ত আত্মজীবনী-ই সাক্ষি,পিতার কথা বঙ্গবন্ধু কখনও ভোলেননি।একজন আদর্শ স্নেহপ্রবণ পিতা,স্নেহময়ী জননী এবং মমতাময়ী স্ত্রীর পরিচয়ও আমরা পাই বইটির প্রতিটি ছত্রে।
পাকিস্তান সৃষ্টি প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর কিছু প্রগতিশীল চিন্তার স্বরূপ আমরা দেখি তাঁর লেখনির মাধ্যমে।তিনি বিশ্বাস করতেন,ধর্মের প্রশ্নে দেশ ভাগ হলেও ধর্ম নিয়ে কোন ভেদাভেদ থাকবেনা।হিন্দু-
মুসলিম সম্প্রীতির প্রশ্নে তিনি প্রগতিবাদী ছিলেন।বাংলা ভাগ হোক এটি তিনি চাইতেন না,কিন্তু কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলার মানুষের এই আবেগের জায়গাটি বুঝতে সক্ষম হয়নি,ছাড় দেয়নি কংগ্রেসও।তাই বাংলা ভাগ হল,কলকাতা হাত ছাড়া হয়ে গেল আমাদের।বঙ্গবন্ধুর ভাষায়
"বাংলাদেশ যে ভাগ হবে,বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না।সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা।"
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে সখ্যতা নিঃসন্দেহে শেখ মুজিবুর রহমান কে বঙ্গবন্ধু হতে সাহায্য করেছিল।ছাত্র জীবনেই সোহরাওয়ার্দীর সাথে তাঁর পত্র যোগাযোগ ছিল।অসমাপ্ত আত্মজীবনী যে সময়ের উজ্জ্বল বর্ণনা সেই সময়টি মূলত সোহরাওয়ার্দীর সাথে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামি পথ চলার কাল।শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং তাঁকে আদর্শ হিসেবে মানলেও আত্মসম্মানের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু যে কতখানি ইস্পাত কঠিন মনোবলের অধিকারী ছিলেন সেটির পরিচয়ও বইটিতে পাওয়া যায়।একটি সভায় বঙ্গবন্ধুর সাথে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা কাটাকাটি হলে এক পর্যায়ে সোহরাওয়ার্দী বলেন,' You are nobody.' জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'One day I will prove that I am somebody.' রেগেমেগে সভাস্থল ত্যাগ করে যাওয়ার সময় সোহরাওয়ার্দীই আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনেন,কাধে হাত রেখে বলেন,"তুমি কেন বোঝনা,তোমাকে বেশি স্নেহ করি বলেই তোমার সাথে রাগ করি।" বস্তুত সোহরাওয়ার্দী-বঙ্গবন্ধু গুরু-শিষ্য জুটিই সেই সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে অতি উল্লেখযোগ্য এবং বিশেষ শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাধারণ মানুষের নেতা।পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লীগের সাথে যোগ দিলেও তৎকালীন মুসলিম লীগের গঠনটি তাঁর মনপূত ছিলনা।'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' তে তিনি বলছেন-
"১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হয়েছে।লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছে।এই সময় আমি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য হই।... এই সময় থেকে মুসলিম লীগের মধ্যে দুইটা দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।একটা প্রগতিবাদী দল,আর একটা প্রতিক্রিয়াশীল।শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা মুসলিম লীগ কে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই,জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই।মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই।জমিদার,জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল।কাউকেও লীগে আসতে দিতনা।"
বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করতে চেয়েছেন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে,বলাই বাহুল্য পরবর্তীতে সে পথেই তিনি এগিয়েছেন।বইটির পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ লক্ষ করলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই জনগণ কেন্দ্রিক রাজনীতির ধারাটি বোধগম্য হবে।
বঙ্গবন্ধুর চীন,ভারত এবং পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের সাবলীল বর্ণনা বইটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।পাঠক একজন উঠতি সম্ভাবনাময় তরুন রাজনীতিবীদের চোখ দিয়ে দেখতে পাবেন আগ্রার তাজমহল,আজমীর শরিফ সহ অন্যান্য দেশ গুলোর নানা ঐতিহাসিক স্থান।এই দেখা সাধারণ মানুষের দেখা নয়।বঙ্গবন্ধুর এই ভ্রমণ সংক্রান্ত বিবরণ পাঠক কে ভিন্ন স্বাদ দেবে,বলাই বাহুল্য।
বইটির গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে পাকিস্তান জন্ম পরবর্তী ভাষা আন্দোলন নিয়ে।ভাষার প্রশ্নে,রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন বঙ্গবন্ধু।কারা বরণ করেছেন বারবার।৫২'র একুশে ফেব্রুয়ারিও তিনি আবদ্ধ ছিলেন কারা প্রকোষ্ঠে।বইটির শেষ অংশ টুকু আমাদের অশ্রু সজল করে।সেই সাথে আমরা বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হই।একজন মানুষ কি করে এতটা ইস্পাত কঠিন মনোবলের অধিকারী হতে পারে ন্যায়ের প্রশ্নে! আমরণ অনশনের যে বর্ণনা আমরা দেখি তা পড়ে যে কারও পক্ষেই বিস্মিত অশ্রু লুকিয়ে রাখা কঠিন বৈকি।অকথ্য নির্যাতন আর চাপের মুখে,মৃত্যুর কাছাকাছি পৌছে যাওয়ার পরও তিনি ছিলেন নিজ দাবিরে অনড়,অটল।অবশেষে রাষ্ট্রই তাঁর কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়, নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয় তাঁকে।
মূলত, এই সময়টাতে এসেই 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' সমাপ্ত হয়ে গেছে,থেকে গেছে অসমাপ্ত।পাঠক প্রচন্ড অতৃপ্তি নিয়ে বসে থাকবেন এর পরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বঙ্গবন্ধুর জবানীতে শুনতে,কিন্তু সেই সুযোগ ইতিহাস আমাদের দেয়নি।এর পরের সময়টুকু আরও অস্থির সময়-আমাদের বাংলাদেশের জন্মের সময়।শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার সময়।'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' হয়তো অসমাপ্ত কিন্তু 'মানুষ' বঙ্গবন্ধু কে জানার বোঝার যে তৃষ্ণা আমাদের ছিল তা মেটাতে এই বইটির আগমন ইতিহাসের অনেক অদেখা সময় কে মূর্ত করে তুলেছে।তাই এটি কেবল একটি বই কিংবা আত্মজীবনীই নয়,এটি হয়ে উঠেছে এক মহানায়কের মহাকাব্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন