ধর্মীয় শোষণ
ধর্মীয় শোষণঃ
এখানে শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়
যাজক সম্প্রদায় (মোল্লা-পাদ্রী-পুরুত) ও
তথাকথিত গুরুরা। এরা তাদের ক্ষুদ্র
স্বার্থ বা ব্যষ্টিগত স্বার্থ পূর্ত্তির
জন্যে অন্যকে শোষণ করে থাকে।
এরা বিভিন্ন ধরণের ভাবজড়তার(dogma)
প্রচার করে ও মানস-অর্থনৈতিক শোষণ
করে।
যেমন,-
*এরা ঈশ্বরের দূত রূপে কাউকে প্রচার
করে।
*এরা স্বর্গের লোভ ও নরকের ভয় দেখায়।
*এরা অর্থের দ্বারাও কিছু লোককে
প্রভাবিত করে একটা ‘ধর্মীয় মোসাহেব
গ্রুপ’ তৈরী করে।
*এরা মানুষের মনে বিভিন্ন ধরণের
অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার ঢুকিয়ে দেয়।
*এরা তাদের শিষ্যদের অন্ধভাবে তাদের
নির্দেশ অনুযায়ী চলতে শেখায়। এরা
বলে ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু
দূর’।
*এরা বিভিন্ন ধরণের বাহ্যিক আচার-
অনুষ্ঠানের, তীর্থের, মূর্ত্তিপূজার
মাহাত্য প্রচার করে।
*এরা বিভিন্ন ধরণের যুক্তিহীন শাস্ত্র,
কাল্পনিক উপাখ্যান বা পুরান ইত্যাদি
তৈরী করে আর এগুলি অভ্রান্ত সত্য বলে,
দৈব আদেশ বা স্বপ্নাদেশ বলে প্রচার
করে ও মানুষকে অর্থনৈতিক ভাবে শোষণ
করে।
যেমন,-সুবিধাবাদী, স্বার্থপর ব্রাহ্মণ
সমাজ বিভিন্ন ধরণের শাস্ত্র, পুরাণ ,
ধর্মগ্রন্থ ইত্যাদি রচনা করে মানুষকে
শিখিয়েছে – যাগযজ্ঞ কর, শীতলা-
মনসা প্রভৃতির পূজা কর। আর সমস্ত কাজ
ব্রাহ্মণকে দিয়ে করিও, কারণ ব্রাহ্মণ
ছাড়া অন্য কেউ এই সব ধর্মীয় কাজে
অধিকারী নয়। এই ভাবে ব্রাহ্মণকে কর
দেওয়াই হলো অন্য সকলের ধর্ম চর্চার
প্রধান অঙ্গ। আর এই ভাবে ব্রাহ্মণগণ
অন্যান্য জাতির নিকট থেকে তাদের
ভূমিষ্ট হবার পূর্ব থেকেই কর আদায় করতে
লাগল। সন্তান গর্ভে এলে পঞ্চামৃত, তার
পরে জন্ম হয়। জন্ম হলে ষষ্ঠী পূজা হতে
আরম্ভ করে মৃত্যু পর্যন্ত ব্রাহ্মণকে কর
দিতে হয়। মরে গেলেও কর দেওয়া বন্ধ হয়
না। শ্রাদ্ধ, বার্ষিক শ্রাদ্ধ, সপিণ্ডকরণ
ইত্যাদি আছে। এই ভাবে অন্যান্য জাতি
জন্মের পূর্ব থেকে মৃত্যুর পর বহু দিন
পর্যন্ত কর দিয়ে আসছে। এইরূপ অদ্ভুত কর
আদায়ের ব্যবস্থা পৃথিবীতে আর কোথাও
দেখা যায় না।
আবার বিভিন্ন ধরণের উৎসব ও দেব দেবীর
পূজা, এ সব ব্রাহ্মণদের হাতে, অন্য
জাতিরা শুধু তার ব্যায় করবে মাত্র।
তাই পৌরাণিক হিন্দু সমাজে মানুষের
ধর্ম হলো ব্রাহ্মণকে কর দেওয়া। দোল,
দুর্গোৎসব, কালীপূজা, লক্ষ্মীপূজা তো
আছেই , এছাড়া আছে তেত্রিশ কোটি
দেবতার পূজা- আর পূজা মানে
ব্রাহ্মণকে কর দেওয়া, উত্তম আহার,
দক্ষিণা, কাপড় ইত্যাদি।
আবার গুরুরূপে ব্রাহ্মণগণ কানে মন্ত্র দেয়
আর তখন থেকে শিষ্য তার চিরকালের
সম্পত্তি হয়। তখন থেকে গুরুর আর কিছু
করতে হয় না। শিষ্যবাড়ী গেলে শিষ্যের
গোষ্ঠীবর্গ তাঁর চরণে মাথা কুটবে, তার
অর্থ থাক বা না থাক গুরুকে প্রণামী
দিতেই হবে।
এই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা শুধু ঠকিয়ে অর্থ
উপার্জন করে তাই নয়, এরা সমাজে
অপরিসীম সন্মানও লাভ করে। ১০/১২
বছরের ব্রাহ্মণ বালককে ৮০ বছরের অন্য
জাতির বৃদ্ধ মানুষও পায়ে পড়ে প্রণাম
করে।তাছাড়া যিনি ব্রাহ্মণ তিনিই গুরু,
তার ‘চরণামৃত’, ‘অধরামৃত’ পান করলে
সমস্ত আপদ নষ্ট হয়।
সমাজে এই সব ধর্মমতের প্রতিক্রিয়াঃ
এই ধর্মমতগুলি সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি
করেছে। জনগণ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপে
বিভক্ত হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপ কতকগুলি
ডগমার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিটি গ্রুপ পরস্পরকে সহ্য করতে পারে
না। এই ধর্মমত নিয়ে পৃথিবীতে অনেক
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়ে গেছে।
মুক্তির উপায়ঃ
মানব ধর্ম/ ভাগবত ধর্মের প্রচার। মানব
ধর্ম বা ভাগবত ধর্মের প্রচারে এইসব
শোষকেরা ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান
হারিয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে। কারণ তারা
জানে মানব ধর্মের প্রচারে জনগণ সচেতন
হয়ে তাদের স্বরূপ বুঝে ফেলবে আর
তাদের শোষণ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।-
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন