জাত
প্রশস্থ বাগানের এক প্রান্তে দাড়িয়ে খুব মনোযোগ সহকারে ফুল গাছে জল দিচ্ছেন সুহাসীনি দেবী। বসন্তের মাতাল হাওয়ায় তার অবাধ্য খোলা চুল গুলো উড়ছে। সদ্য প্রস্ফুটিত তাজা টকটকে লাল গোলাপ ও যেন তাকে হেসে হেসে মৃদু দুলে সঙ্গ দিচ্ছে । বড্ড তৃপ্তি নিয়ে এই কাজটা করে সুহাসীনি দেবি। বাগানের পরিচর্যার জন্য যথেষ্ট মালি থাকলেও তার ভালো লাগে এই কাজটি করতে। ভোরের এক ফালি মিস্টি রোদ্দুর সুহাসীনি দেবীর মুখের ওপর একেবারে লেপ্টে পড়ে আছে । চকচক করছে তার সোনার অঙ্গ। কার সাধ্যি আছে এই মহীয়সী নারীকে দেখে বোঝার সে একজন অর্ধ বয়স্কা নারী। তার তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। এখনো রুপ যেন তার পূর্নিমার চাঁদের আলোর ন্যায় ঠিকরে পড়ছে।
বোঝাই যায় না জানি ভরা যৌবনে কতো নিরীহ যুবক তার রুপের ঝটকায় মুর্ছা গেছে। জমিদার রন্তিবর্মার একমাত্র আদরের কন্যা ছিলেন সুহাসীনি। সুহাসীনির জন্ম হয়েছিল কোনো এক মহেন্দ্রক্ষণে। আশেপাশের সাত গ্রামের লোকজনকে ঢাক পিটিয়ে জানিয়েছিলেন জমিদার রন্তিবর্মা। সুহাসীনির জন্মের বার্তা যেন সাত গ্রামের লোকের আমোদের কারন হয়ে দাড়িয়েছিল। উৎসবমুখর পরিবেশে সুহাসীনির নামকরন অনুষ্ঠিত হয় মহর্ষির নির্দেশে। বড় স্বাদ করে রন্তিবর্মা সুহাসীনি নাম দিয়েছিল তার কন্যার। সুহাসীনি যেমন রুপবতী তেমন গুনবতী ছিল। রুপে গুনে তার জুড়ি মেলা ভার ছিল। .
"মা ঠাকুরন .... আপনার কেশ সজ্জার সময় হলো যে। ওখানে দাড়িয়ে আছেন যে বড় ..."মিস্টি একটা কন্ঠস্বরে ঘুরে তাকালো সুহাসীনি দেবি। এই মিস্টি কন্ঠস্বরের অধীকারিনী হলো এক ষোড়শী। রুপসী তার নাম। নামের সাথে যেন তার রুপের যুদ্ধ চলে কে কতটা সুন্দর তা নিয়ে। সুহাসীনির বাবা রন্তিবর্মার বিশ্বস্ত কাজের লোক ছিলেন রুপসীর ঠাকুরদাদা। তার বাবারও জীবন কেটে যায় এই বিশাল জমিদার বাড়ির দেখাশোনা করতে করতে। আর রুপসীর ঘাড়ে পড়ে সুহাসীনির সেবার ভার। রুপসী সুহাসীনির সেবা খুব মন দিয়ে করে। তার ব্যাপারে খুবই যত্নশীল সে। সুহাসীনিও রুপসীকে বেশ পছন্দ করে। বড় খাতিরের লোক রুপসী তার কাছে। এবেলা দুজন পানের ডিব্বা নিয়ে গল্প জুড়ে বসলে তো ওবেলা ও তাদের গল্প শেষ হয় না। সুহাসীনির সব দেখাশোনা রুপসীই করে। সুহাসীনির পিতা রন্তিবর্মা আর মাতা সত্যবতি ইহোলোক ত্যাগ করেছেন অনেক কাল আগে। জেষ্ঠ বা কনিষ্ঠ কোনো ভ্রাতা না থাকায় পিতার মৃত্যুর পর বিশাল সম্পত্তির দায়িত্ব এসে পড়ে সুহাসীনির ওপর। জমিদারের পুত্রী হওয়ার সুবাদে পুঁথিগত বিদ্যা আয়ত্তে আনার সুবিধা টুকু তিনি পেয়েছিলেন। এজন্য সব সম্পত্তির হিসেবে নিকেশ রাখতে তাকে খুব একটা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় নি।
বিশাল সম্পত্তি আর জমিদারি সামলাতে সামলাতে সুহাসীনি দেবির আর পাত্রস্থ হওয়া হয়ে ওঠে নি। আবার বিয়ে না করার অন্য কারন ও থাকতে পারে সেটা অজানা। সুহাসীনি দেবী তার কেশ সজ্জার জন্য গিয়ে বসলো রুপসীর কাছে। ঘনো কালো সুদীর্ঘ চুলে সুগন্ধি তেল দিতে দিতে উচ্ছ্বাসের সাথে বলল রুপসী, "মা ঠাকুরনের কেশগুলো দেখে এরুপ জ্ঞ্যাত হয় যেন এ কেশ কেশ নয় এ যেন সিংহের কেশর। যেমনি মোটা আঁশের কেশ তেমনি ঘনো আর সুদীর্ঘ। "
রুপসীর কথা শুনে সুহাসীনি মৃদু হাসে। খানিক থেমে রুপসী বেশ কৌতুহল নিয়ে সহসাই জিজ্ঞেস করে, "আচ্ছা মা ঠাকুরন একখান কতা সেই কবে থেকে মনে কাটার মত বিধে আছে।কিন্তু কিছুতেই কাটাটা সরাতে পারছি নে। অপরাধ না নিলে কতাখান সুধাই মা ? "
সুহাসীনি মৃদু হেসে বলে, " বেশ সুধা তোর কি কতা ...শুনি দেখি তোর মনে কি এমন কতা কাটার মত বিধে আছে। রুপসী বেশ খুশি হয়ে সুহাসীনির কেশ সজ্জা শেষ করে তার পায়ের কাছে এসে বসে বলে, "তোমার এই রুপ। এখনো দেখে যে কোনো নারী হিংসেই জ্বলে যাবে। না জানি তোমার যৌবন কালে কত পুরুষকে তুমি তোমার রুপের তেজে কাবু করে দিয়েছো। এত রুপবতী ছিলে তুমি। গোটা শতেক যুবক যে নৃত্য তোমার রুপের সাগরে ডুবে মরতো না কো এ কতা আমি মোটে বিশ্বেস যাই নে। কিন্তু তুমি তো শত যুবুকের মুখে নুড়ু জ্বেলে চিরকালই কুমারীই রইলে। ও মা ঠাকুরন বলো না বলো তোমার মনের মত কি এমন কোনো পুরুষের সন্ধান তুমি পাও নি কো? এমন কোনো সুদর্শন পুরুষ কি তোমার এই অমূল্য হৃদয়খানাকে বেকুল করে তোলে নি? "
কথা গুলো শুনে খানিকক্ষণের জন্য মৌন হয়ে যায় সুহাসীনি। তারপর উদাস হয়ে বলা শুরু করে,
"হুম ...এক সুদর্শন পুরুষ আমার হৃদয় হরন করেছিল। প্রতি দিন তার পানে অবাক নয়নে চেয়ে থাকতাম।
অবিন দা ছিল আমার সেই সুদর্শন পুরুষ ....। আমাদের জমিদার বাড়িতে প্রায়শই তার যাতায়াত ছিল। গ্রামে সেই ছিল সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত আর বিদ্বান । বারো ক্লাশ পাস দিয়েছিল সে।
বাবার জমিজমা নিয়ে কি সব হিসেবে পত্র করতে সে আসতো। দু একবার তার সঙ্গে কতা হয়েছিল। আর বেশিরভাগ কতা হতো আমাদের চোখে চোখে। ছেলেটার নেত্র পল্লব দুখানি বড্ড মায়াবী ছিল। আমার চোখের সব বোবা ভাষা সে বুঝে নিত। আস্তে আস্তে অবিনদা কে আমার মনে ধরতে শুরু করে। বসন্তের হাওয়া যেন হৃদয়ে দোলা দিতে শুরু করে। তখন আমার ভরা যৌবন। এ বয়সে কাউকে মনে ধরা গুরুপাপ এর মত কোনো পাপ নয়। আমি বুঝতে পারি আমি অবিনদা কে মন দিয়ে ফেলেছি আর সে ও আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু জমিদারের কন্যা বলে সাহসী হলেও বাবাকে বলার সাহসে তার কুলোয় না এভাবেই চলতে থাকে বোবা ভাষার অনূভুতিতে গড়া প্রেম। দিনদিন অবিনদার আমাদের বাড়িতে আসা বেড়ে যায়। নানা ছলে সে আমায় দেখতে চায়। আমিও বড্ড ব্যাকুল হয়ে থাকতাম তাকে একবারটি দেখার আশায়। এভাবে বেশ কিছুদিন যায়। বাবা আমার জন্য সুপাত্র খুজতে শুরু করেন। আর এ কতা শুনেই আমার হৃদয়ে প্রলয় শুরু হয়। আমি তো ততদিনে অবিনদাকে হৃদয়খানা দিয়ে বসে আছি। এই হৃদয় খানা তো আর ফেরত পাওয়ার মত নয়। তবে কি করে অন্য এক পুরুষের রমনী হবো আমি। আমার মন তো দিবারাত্র অবিনদার সাধনায় মগ্ন। অনেক সাহস বুকে নিয়ে বাবার কাছে যাই। গিয়ে বাবাকে বলি আমি অবিনদাকে ছাড়া বাঁচাতে পারবো না। অবিনদা ব্যতিত অন্য পুরুষ আমার জীবনে আসবে এটা আমার কল্পনার অতীত। বাবা আমার সব কথা শুনে প্রচন্ড রেয়ে গেলেন। কারন অবিনদা ছিল আমাদের জাতের চেয়ে নিচু জাত। বাবা নিজের বংশ জাত এসব নিয়ে খুব গর্ব করতো। আমি আদরের একমাত্র মেয়ে হলেও আমার থেকে বেশি বড় ছিল তার কাছে তার অহংকার! সে কিছুতেই তার মেয়ের সাথে নিচু জাতের ছেলের সম্পর্ক মেনে নিবেন না
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন