ধর্ম

ইসলাম ধর্মের সব থেকে আদর্শ ও মানবিক দিক বলে আমার মনে হয় সুফীবাদ কে। অবশ্য সুফীবাদকে প্রাক্টিসিং মুসলমান আর তাদের নেতারা সঠিক ইসলাম হিসেবে গণ্য করেনা। তারা বরং সুফিদের ধর্মদ্রোহী আর পথভ্রষ্ট উন্মাদ হিসেবে দেখে। অথচ সুফীবাদই আক্ষরিক ইসলামের কঠিন সব নিয়ম ভেদ করে, পুরষ্কার আর শাস্তির ভয় ত্যাগ করে কেবল ভালোবাসার জন্যই আল্লাহকে ভালোবাসে, ভয় করেনা। সুফীদের কাছে আল্লাহ দূরবর্তী কোন সত্ত্বা নয়, বরং নিজেদের মধ্যেই বিচরণরত বিশুদ্ধতম একক।
প্রাক্টিসিং মুসলমানদের কাছে আল্লাহ এক ক্রুদ্ধ শাসক, যিনি কিনা তার বান্দাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজ গুলো নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, এবং তার নিজের সৃষ্টিকে শাস্তি দেয়ার জন্য ভয়াবহ নরক প্রস্তুত করে রেখেছেন। এমন আল্লাহকে ভয় করতে শিখানো হয়। কিন্তু সুফীদের কাছে আল্লাহ কোন ভীতিকর নাম নয়, ভালোবাসার নাম। আল্লাহ তাদের শাসক নয়, প্রেমিক। তারা মনে করেন প্রাচীন কালে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বেহেশত দোযখ ইত্যাদি ধারণা গুলো সৃষ্টি হয়েছিল উপমা হিসেবে কিন্তু কালক্রমে মানুষ মূল শিক্ষা ভুলে গিয়ে উপমা গুলোকেই সত্য হিসেবে মান্য করে যাচ্ছে! সুফীরা তাই শোনায় প্রেমের বাণী। তারা আক্ষরিক অর্থেই, সোজা বাংলায় আমরা যাকে বলি প্রগতিশীল ও মানবিক- ঠিক তাই।
আমাদের এই অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটেছে এই সুফী সাধকদের হাত ধরেই। একারণে সুফীবাদ সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক। একারণেই আমাদের এ অঞ্চলে সহজীয়া ইসলাম প্রচলিত ছিল, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ আকৃষ্ট হয়েছিল যে ইসলামের প্রতি। বখতিয়ার খিলজির তলোয়ার এর থেকে সুফীদের ভালোবাসার বাণী বেশি আকৃষ্ট করেছিল সাধারণ মানুষদের। তাই সকল ধর্মের মানুষদের পাশাপাশি বাস করতে অসুবিধা হয়নি। কারণ সুফীরা আল্লাহ ও রাসূলে বিশ্বাস করলেও ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার অধিকারী ছিলেন। প্রতিটি ধর্মই তাদের কাছে এক স্রষ্টার নিকট যাবার পথ। তারা কোরানকে আক্ষরিক অর্থে নিতেন না, বলতেন কুরান আসলে সাংকেতিক, একে আক্ষরিক ভাবে নিলেই বিপদ!
সুফীরা সংগত কারণেই প্রাক্টিসিং মুসলমানদের সুনজরে ছিলেন না। সেই বায়েজিদ বোস্তামি থেকে রুমি- সকলেই সমসাময়িক ইসলামি নেতৃবৃন্দের চক্ষুশূল ছিলেন। রুমির আধ্যাত্মিক গুরু শামস তাবরিজিকে তো হত্যাই করা হয় 'ধর্মদ্রোহীতা'র অপরাধে!
সুফীবাদী ইসলামের চর্চা আমাদের এখানে চালু থাকলে হয়তো ইতিহাসের গতিপথ অন্য রকম হত। তবে সেটা হতে দেয়নি যে মানুষটি তার নাম হাজী শরিয়ত উল্লাহ। তিনি আরব থেকে 'সহিহ ইসলাম' এর ধারণা নিয়ে এসে সেটা এখানে প্রচার করেন। সুফীদের প্রচলিত এবং সাধারণ মানুষের নিজস্ব রীতিনীতি গুলো কুসংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলোকে দূর করতে চেষ্টা করেন। শান্তিবাদী ধারা থেকে পতন ঘটে আমাদের, আক্ষরিক এবং হিংসুটে ধর্ম চর্চা শুরু করি আমরা।
বলাই বাহুল্য, সুফী নামধারী হলেই কেউ সুফী হয়না। বহু বছরের ব্যবধানের সুফীবাদেও বিকৃতি এসেছে। কিন্তু তারপরেও এর তুলনা মেলা ভার।
"খ্রিস্টান, ইহুদি এবং মুসলমানরা যখন বাইরের খোসা নিয়ে ঝগড়া করে চলেছে,সুফি তখন খুঁজে ফিরছে ভিতরের অংশকে।"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাক্ষসী। পর্ব-১

শেষ গানটির মত

প্রেতে ও মানুষে। পর্ব-৪(শেষ পর্ব)