সন্তুষ্ট- এটা আমাদের 'গুণ' নয়, আমাদের অগ্রগতির পথে মস্ত এক বাঁধা।
সন্তুষ্টি স্থবিরতার লক্ষণ। কোন বিষয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া মানে সেখানে আর কোন উন্নতির সুযোগ নেই- এটা স্বীকার করে নেয়া। আমাদের সমাজ-সভ্যতা-দর্শন-বিজ্ঞান সব কিছু গড়ে উঠেছে অসন্তুষ্টি থেকে। গুহাবাসী মানুষ যদি তাদের গুহা-জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতো, তাহলে আজও আমরা গুহাতেই বসবাস করতাম। আকাশে উড়তে পেরেই সন্তুষ্ট থাকলে মানুষ চাঁদে পদার্পন করতে পারতো না। আবার চাঁদ পর্যন্ত সন্তুষ্ট থাকলে মঙ্গলে রোবট পাঠানো হত না। যেকোন অগ্রগতির মূলে রয়েছে বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্টি, এবং সেই অসন্তোষকে জয় করার ইচ্ছা।
আপনি যদি দশ টাকা আয় করে সন্তুষ্ট থাকেন, তবে ঐ দশ টাকাই আপনার সর্বোচ্চ সীমা। একই ভাবে সরকার যা করে, তাতেই যদি আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যান, তাহলে সেই সরকার আর কাজই করবেনা। তাই সরকার ব্যবস্থাকে গতিশীল করতে হলে নাগরিক অসন্তোষ প্রকাশ করা জরুরী। এই সহজ সূত্রটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনা। তাই কোন সমালোচনা করতে গেলেই একদল লোক এসে বিচিত্র সব উদাহরণ নিয়ে হাজির হয়। যেমন,আপনি যদি ডাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তাহলে একদল লোক বলবে, 'ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা তো কী হয়েছে, অনেক উন্নত শহরেও জলাবদ্ধতা হয়, আপনারা শুধু ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেন! ' অথবা, 'শুধু জলাবদ্ধতাই দেখলেন, পদ্মা-সেতুর পীলার দেখলেন না'।
যেকোন বর্বর সমাজে, যেখানে অধিকাংশ সিস্টেম অচল এবং সরকার যেখানে শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়- সেখানে এসব সমালোচনাকে, এসব অসন্তোষকে খারাপ চোখে দেখা হয়। কারণ, শাসক পক্ষ জানে এসব অসন্তোষ প্রকাশ তাকে বিপদে ফেলবে। লক্ষ করে দেখবেন, 'যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা'র শিক্ষা আমাদের ছোটবেলা থেকেই প্রদান করা হয়- পরিবার,সমাজ এবং ধর্মের মাধ্যমে।শুধু তাই না, অল্পতে সন্তুষ্ট থাকা বা যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা-এগুলোকে মধ্যবিত্তের 'গুণ' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যে জাতি 'যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট' থাকে, তাদের পক্ষে কখনো জাতিয় জীবনে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব নয়।
অন্য কোন শিক্ষা আমাদের মস্তিষ্কে সেভাবে প্রবেশ না করলেও, এধরণের কুশিক্ষা গুলো আমরা সহজেই রপ্ত করি। কাজেই আমরা খুব ভাল ভাবে 'যা আছে তাতে সন্তুষ্ট' হয়ে যাওয়ার শিক্ষাটুকু অর্জন করে নিয়েছি। আমরা অল্পেই সন্তুষ্ট- এটা আমাদের 'গুণ' নয়, আমাদের অগ্রগতির পথে মস্ত এক বাঁধা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন